উদ্ভিদের বংশবৃদ্ধিতে প্রথম যে প্রযুক্তির কথা বলতে হয় তা হচ্ছে উচ্চফলনশীল জাতের বীজ। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান শাকসবজি, গম, সরিষা, আলু ইত্যাদি ফসলের অনেক উন্নত এবং উচ্চফলনশীল জাতের উদ্ভাবন করেছে। শাকসবজির মধ্যে টমেটো, বেগুন, লাউ, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মরিচ এসবের নাম উল্লেখযোগ্য। এসব উন্নত জাতের সবজির বীজ কৃষকেরা পাচ্ছেন এবং ব্যবহার করছেন। গ্রীষ্মকালেও টমেটোর চাষ করতে পারছেন। বারমাসব্যাপী বেগুন ও লাউয়ের চাষ করছেন। আরও কতো কী। এর ফলে কৃষকেরা ভালো আয় করছেন।
বাংলাদেশে ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান এ পর্যন্ত ৭৮টি উচ্চফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। এর সাথে আরও ধানের জাত যুক্ত করেছে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। উচ্চফলনশীল ধানের জাতের অবদান হিসেবে বলা যায় বাংলাদেশ এখন প্রায় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। নিচে কয়েকটি ধানের জাতের নাম উল্লেখ করা হলো।
আউশ : বি আর ৯ (সুফলা), বি আর ১৪ (গাজী), বি আর ১৬ (শাহী বালাম) ইত্যাদি।
আমন : বি আর ১১ (মুক্তা), ব্রি ধান ৩০, ব্রি ধান ৩৩, ব্রি ধান ৪০, ব্রি ধান ৪৪ ইত্যাদি।
বোরো : ব্রি ধান ২৮, ব্রি ধান ২৯, ব্রি ধান ৩৬, ব্রি হাইব্রিড-১, ব্রি ধান ৫০ (বাংলামতি) ইত্যাদি।
বীজ উৎপাদন একটি প্রযুক্তিগত কর্মকাণ্ড। বীজ উৎপাদনের প্রথম কাজ হলো বীজের গুণাগুণ সংরক্ষণ করা। তাই কৃষিবিজ্ঞানীরা অবিরাম ফসলের জাতের বংশবৃদ্ধি ও গুণাগুণ সংরক্ষণের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করছেন এবং নতুন নতুন প্রযুক্তি সংযোগ করছেন। বীজ উৎপাদন প্রযুক্তি বলতে মানসম্মত বীজ উৎপাদন, ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণকে বোঝায়। মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদনের জন্য বিজ্ঞানীরা নিচে উল্লিখিত শর্তসমূহ মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন।
১। বীজের বিশুদ্ধতাসংরক্ষণ : বীজের পরিচিতি এর জন্মসূত্র থেকে। অতএব, বীজ উৎপাদনের সময় লক্ষ রাখতে হবে যেন আকাঙ্ক্ষিত বীজের সাথে অন্য জাতের বীজের মিশ্রণ না ঘটে।
২। বীজ ফসলের পৃথকীকরণ: বীজ ফসলের জমিকে অবীজ ফসলের জমি থেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখার নামই পৃথকীকরণ। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা অনেক সময় সম্ভব হয় না। তাই বীজ ফসলের চারদিকে বর্ডার লাইন হিসেবে একই ফসলের অতিরিক্ত চাষ করতে হয়। এতে পর-পরাগায়নের সম্ভাবনা থাকে না।
৩। বীজ শোধন: বীজ জীবাণু বহন করতে পারে। সেজন্য জমিতে বপনের আগে বীজ শোধন করে নিতে হয়। বীজ শোধন করার জন্য অনেক ঔষধ ব্যবহার করা হয়। যেমন, গ্রানোসান-এম, ভিটাভেক্স-২০০ ইত্যাদি।
৪। বীজ বপন পদ্ধতি: বীজ সময়মতো বপন করতে হবে। আর বীজ বপনের সময় জমিতে যথেষ্ট রস থাকা প্রয়োজন। সাধারণত বীজ ফসল নির্দিষ্ট দূরত্বে লাইনে বপন বা রোপণ করা ভালো। লাইনে বীজ বপনের জন্য বীজ বপনযন্ত্র ব্যবহার করা যেতে পারে।
৫। রগিং: বীজের জাতের বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য রগিং একটি জরুরি কাজ। রগিং অর্থ হচ্ছে আকাঙ্ক্ষিত বীজের গাছ ছাড়া আগাছাসহ অন্য যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত গাছ জমি থেকে শিকড়সহ তুলে ফেলা। ফুল আসার আগেই অনাকাঙ্ক্ষিত গাছ রগিং করা ভালো।
৬। আন্তঃ পরিচর্যা
১. বীজের জমি আগাছামুক্ত রাখতে হবে।
২. যথাসময়ে কীটপতঙ্গ দমন করতে হবে।
৩. পরিমাণমতো পানি সেচ দিতে হবে।
৭। বীজ ফসল কর্তন: বীজ যখন পরিপূর্ণভাবে পরিপক্ক হয় ও বৃষ্টিবাদলে ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে না তখনই বীজ ফসল কর্তন করতে হয়। বীজ ফসল কাটার পর পরিষ্কার পরিচ্ছন্নভাবে মাড়াইঝাড়াই করতে হবে।
৮ । বীজ শুকানো ও সংরক্ষণ : বীজ এমনভাবে শুকাতে হবে যাতে বীজে অতিরিক্ত আর্দ্রতা না থাকে। যেমন, ধানের বীজে শতকরা ১২ ভাগ আর্দ্রতা থাকতে পারে। ভালোভাবে শুকানোর পর বীজ সংরক্ষণের জন্য মাটি অথবা ধাতব পাত্রে রাখতে হবে। পাত্রটি অবশ্যই শুষ্ক, পরিচ্ছন্ন হতে হবে। বীজে যাতে কীটপতঙ্গ আক্রমণ করতে না পারে সেজন্য ম্যালাথিয়ন স্প্রে করা যেতে পারে।
মানসম্মত বীজের উৎপাদন
মানসম্মত বীজ তিন ধাপে উৎপাদন করা হয়।
যথা-
১) মৌল বীজ
২) ভিত্তি বীজ
৩) প্রত্যয়িত বীজ।
কৃষকের প্রত্যয়িত বীজ ছাড়া অন্য বীজ ব্যবহার করা উচিত নয়। যদি কেউ ফসল উৎপাদনে প্রত্যয়িত বীজ ছাড়া সারহীন বীজ ব্যবহার করেন তবে ফসল ভালো না হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরই বিশেষজ্ঞরা প্রত্যয়িত বীজ ব্যবহারের অনুমোদন প্রদান করেন। নিচে বীজ উৎপাদনের ধাপগুলো আলোচনা করা হলো-

মৌল বীজ: উদ্ভিদ প্রজন্ম বিজ্ঞানীদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে গবেষণা প্রতিষ্ঠানে উচ্চ বংশগত গুণাগুণ সম্পন্ন যে বীজ উৎপাদন করা হয় তাকে মৌল বীজ বলে। মৌল বীজ সাধারণত কম পরিমাণে উৎপাদন করা হয়। এ বীজ বিক্রয়যোগ্য নয়।
ভিত্তি বীজ: বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের খামারে বীজ অনুমোদন সংস্থার নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে মৌল বীজ থেকে যে বীজ উৎপাদন করা হয় তাকে ভিত্তি বীজ বলে।
প্রত্যয়িত বীজ: ভিত্তি বীজ থেকে বীজ অনুমোদন সংস্থার নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে যে বীজ উৎপাদন করা হয় তাকে প্রত্যয়িত বীজ বলে। এই বীজ কৃষকদের ব্যবহারের জন্য অনুমোদন সংস্থা অনুমোদন প্রদান করে। প্রত্যয়িত বীজ কৃষকদের নিকট বিক্রি করা হয়।
| কাজ -১: কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের চুক্তিবদ্ধ কৃষকের খামারে যাও আর দেখ তারা মানসম্মত বীজ উৎপাদনের শর্তগুলো মেনে বীজ উৎপাদন করছে কিনা। কাজ- ২: তোমার কৃষি শিক্ষকের সাথে পরিকল্পনা করে সব শিক্ষার্থী মিলে কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে যাও আর দেখ মৌল বীজ কীভাবে উৎপাদন করছে। |
নতুন শব্দ: বীজের বিশুদ্ধতা, পৃথকীকরণ, বীজ শোধন, রগিং, মৌল বীজ, ভিত্তি বীজ, প্রত্যয়িত বীজ
Read more